রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কোনো গঠনমূলক সিদ্ধান্ত ছাড়াই মায়ানমারে পাঁচদিনের সফর শেষ হয়েছে।শূন্য হাতে ফিরলো জাতিসংঘ কর্মকর্তারা।

Rohingyas-are-fleeing-in-the-face-of-torture-of-Myanmar-army.jpgরোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কোনো গঠনমূলক সিদ্ধান্ত ছাড়াই মায়ানমারে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের পাঁচদিনের সফর শেষ হয়েছে। রাখাইন সফরকারী জাতিসংঘ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, তাদের সফরে ‘কোনো সাফল্য অর্জিত’ হয়নি।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, মায়ানমার থেকে শূন্য হাতে ফিরেছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। মালয়েশীয় সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইট টাইমস লিখেছে, জাতিসংঘ কর্মকর্তারা মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চি এবং সেনাপ্রধান মিং অন-এর সঙ্গে বৈঠক করলেও সেই দুই আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।এএফপির খবর অনুযায়ী, জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেফ্রে ফেল্টম্যান বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মায়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি ও সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

Stephen-Dujaric

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক।

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, ‘পাঁচ দিনের সফরে জেফ্রে ফেল্টম্যান মায়ানমারের কর্মকর্তাদের কাছে মহাসচিব গুয়েতেরেসের আহ্বান পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি আক্রান্ত এলাকায় মানবিক সাহায্যকর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার এবং পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসন দাবি করেছেন।রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। তারা একে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

Jatishanga-Zefre-Feltman

জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রে ফেল্টম্যান রোহিঙ্গাদের আগুনে পোড়া ঘরগুলো দেখেছেন।

সফরকালে বিমানে করে জেফ্রে ফেল্টম্যানকে নিয়ে যাওয়া হয় রাখাইনে। বিমান থেকেই তিনি আগুনে পুড়ে যাওয়া গ্রামের পর গ্রাম দেখতে পান। সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান, রাখাইনে কেন সাহায্য পৌঁছে দিতে সাহায্যকর্মীদের এখনও বাধা দিচ্ছে মায়ানমার। জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা একটা মূল্যবান প্রশ্ন। এই প্রশ্নটি মায়ানমার সরকারের কাছে করতে হবে। আমরা দেখতে চাই যত দ্রুত সম্ভব সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে।’

Feltman-Brief

জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রে ফেল্টম্যান রোহিঙ্গাদের  দূর্ভোগের বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন।মায়ানমার সংকট

এর আগে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা- ইউএনএইচসিআর জেনেভায় বলেছে, বাংলাদেশ ও মায়ানমার সীমান্তের কাছে অবরুদ্ধ হয়ে আছে ১০ থেকে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র আন্দ্রে মাহিকিক বলেছেন, দেশ ছেড়ে যাওয়ার অথবা হত্যার হুমকি থাকা সত্ত্বেও অনেক রোহিঙ্গা এখনও তাদের বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তবে যখন তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তখনই তারা দেশ ছাড়ছেন, পালাচ্ছেন।

মায়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানদের গণহত্যার বিষয়টি ১৩৭তম ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) সম্মেলনে ইমারজেন্সি আইটেম হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে চলমান আইপিইউ সম্মেলনের সাধারণ সভায়  রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয় বলে বুধবার জাতীয় সংসদের গণসংযোগ অধিশাখা থেকে পাঠানো এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে।
আইপিইউ সম্মেলনে ইমারজেন্সি আইটেম হিসেবে বাংলাদেশের কোনো প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম।

Rohingya.jpgআইপিইউ সম্মেলনে ২০ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি।আইপিইউ সম্মেলন চলাকালে বাংলাদেশ সংসদীয় দলের সঙ্গে রাশিয়ার সংসদীয় দলের এক দ্বিপাক্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনাকালে মায়ানমারের জাতিগত নিধনের ভয়াবহতা রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের কাছে তুলে ধরা হয়। বৈঠকে  রাশিয়ার ডেপুটি স্পিকার বাংলাদেশ সংসদীয় দলকে আশ্বস্ত করে জানান,  মানবিক এ সমস্যার সমাধানে রাশিয়া ভূমিকা রাখবে।

Former-Major-General-Fazlur-Rahman

বিডিআর এর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান।

এ প্রসঙ্গে সাবেক বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান বলেন, মায়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে প্রতিবেশী অন্য দেশও তাদের দেশ থেকে মুসলমানদের এ দেশে ঠেলে পাঠাতে উৎসাহ পাবে। তিনি মনে করেন রাখাইনে স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করেই এ সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব।

এদিকে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে,স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুরা।বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ছয় লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে শিশুই রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার। এসব শিশু পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সেবার সংকটে রয়েছে।ইউনিসেফের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি সপ্তাহে ১২ হাজার শিশু শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে। ক্ষুধা ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা বেশিরভাগ শিশুই এখনও মানসিকভাবে বিভীষিকা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

UNICEF.jpgইউনিসেফের কর্মকর্তা সাইমন ইনগ্রাম বলেন, “এই সংকট স্বল্পমেয়াদী নয় এবং খুব তাড়াতাড়ি এর সমাধান হবে না। তাই এটা খুবই কঠিন যে সীমান্ত খুলে দিয়ে যাদের আশ্রয় দেয়া হচ্ছে তাদেরকে বাংলাদেশি শিশুদের মতো সকল সুবিধা নিশ্চিত করা।”দুই সপ্তাহ রোহিঙ্গা শিবিরে থাকার অভিজ্ঞতায় ইনগ্রাম বলেন, এখানে খাবারের সরবরাহ খুবই কম। প্রতি পাঁচজনের একজন শিশুর বয়স পাঁচের নিচে। তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন।

Rohingya-1ক্যাম্পগুলোতে ডায়রিয়া, কলেরাসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি খুবই বেশি। ইউনিসেফ তাদের বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে এবং কলেরার টিকা দিচ্ছে। জাতিসংঘের আহ্বান করা ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার সহায়তার মধ্যে ৭৬ মিলিয়ন ডলার চেয়েছে ইউনিসেফ। তার মাত্র ৭ শতাংশ পাওয়া গেছে বলেও জানান ইনগ্রাম।ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে প্রায় একমত ডাক্তার মো. শরীফ উদ্দিন।

Rohingyas-are-fleeing-in-the-face-of-torture-of-Myanmar-armyরোহিঙ্গা ক্যাম্পে চিকিৎসা সেবার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। বৈরী পরিবেশে থাকার পরও তাদের রোগবালাই কম। ক্যাম্পে থাকা শিশুদের ডায়রিয়া, ঠাণ্ডা-কাশি, নিউমোনিয়াসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেশি। এখানে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। তাছাড়া রোহিঙ্গা শিশুরা কখনো কোনো রোগের টিকা পায়নি। ফলে তাদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।

Rohingya-children-at-health-risk.jpgতিনি আরও জানান, সরকার এরই মাঝে কলেরা টিকা দেয়া শুরু করেছে। এখন হামের টিকা দেয়া প্রয়োজন। এ কাজে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও উদ্যোগ নিতে পারে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

Rohingya-children-at-health-risk-1

এছাড়া শিশুরা ঠিকমতো ওষুধ খাচ্ছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ক্যাম্পগুলোতে ফিল্ড হাসপাতালের সংখ্যা ও পরিসর বাড়ানো প্রয়োজন বলেই মনে করেন এ চিকিৎসক।২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু করে মায়ানমারের সেনাবাহিনী। জীবন ও সম্ভ্রম বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় নয় লাখ ।

suu-kyi.jpg

অক্সফোর্ড কলেজ থেকে অং সান সু চির নাম অপসারিত।

এদিকে,রাখাইনে রোহিঙ্গা মানবিক সঙ্কটে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে অক্সফোর্ড কলেজ তাদের জুনিয়র কমন রুম থেকে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির নাম প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্ট হিউস কলেজের শিক্ষার্থীরা কমন রুম থেকে সু চির নাম মুছে ফেলার পক্ষে ভোট দিয়েছেন।অক্সফোর্ডের এই আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কলেজে সু চি পড়াশোনা করেছিলেন। নাম মুছে ফেলার সিদ্ধান্তে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানকে সমর্থন ও রক্ষায় সু চির নীরবতার ও সহযোগিতা সমালোচনা করা হয়েছে।

Oxford-College-removed-Suu-Kyi's-portrait.jpg

অক্সফোর্ড কলেজ সু চির প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলল

সেন্ট হিউসের সিদ্ধান্তে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, রাখাইনে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সু চির সমালোচনা করতে না পারা অগ্রহণযোগ্য। এক সময় তিনি যে নীতি ও আদর্শের প্রতি অবস্থান নিয়েছিলেন এখন সু চি সেগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।উল্লেখ্য এখানে ১৯৬৪-৬৭ সাল পর্যন্ত সু চি রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। ২০১২ সালে সু চি অক্সফোর্ড থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন। ওই বছরই তিনি নিজের ৬৭তম জন্মদিন কলেজে পালন করেন। suu-kyi.-1jpg.jpg

অং সান সু চি ২০১২ সালে অক্সফোর্ড থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছিলেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s